কয়েকদিন পরই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। প্রতিবার রমজান মাস এলেই নিত্যপণ্যের বাজার চড়া থাকে। এবারও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা ও খেঁজুরসহ প্রভৃতি নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। চাপ সামলানোর সক্ষমতা না থাকায় এক ধরনের অস্বস্তি, অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মাঝে। সরকার অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে টিসিবির মাধ্যমে ট্রাক এবং ডিলারের মাধ্যমে এসব নিত্যপণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ কিছুটা সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির ট্রাকসেলের লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। ভোর থেকেই রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে ট্রাকসেলে সাশ্রয়ী দামে পণ্যের আশায় নিম্ন আয়ের মানুষের ভিড় শুরু হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিসিবির ট্রাকসেলের লাইনে দাঁড়িয়েও পণ্য কিনতে পারছেন না সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, শীতকালীন শাক-সবজির পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার কারণে অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল রাজধানীর সবজি বাজার। আবারও শাক-সবজির দাম বেড়েছে। তার সঙ্গে মাছ, মাংসসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, খেঁজুর, চাল, ডাল ও মসলার দামও বাড়তি। রোজার আগে এসব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রমজান আসার আগেই বাজারে ভোজ্যতেল-চালসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য মজুত করে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। ক্রেতারা বলছেন, রমজানের আগে ফের অস্থির হয়ে পড়েছে তেলের বাজার। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কয়েক দোকান ঘুরেও বোতলজাত সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না ক্রেতারা। আর কবে নাগাদ বাজারে সরবরাহ ঠিক হবে, সেটিও জানাতে পারছেন না বিক্রেতারা। এই অবস্থায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিনের দাম প্রতি লিটারে ১০/২০ টাকা বেড়েছে। তবে বিক্রেতারা জানান, গত নভেম্বর মাস থেকেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। এ সময়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে আট টাকা বাড়ানোর পরে সরবরাহের সংকট কিছুটা কমেছিল। তবে চলতি মাসের শুরু থেকে আবার তীব্র হয়েছে এ সংকট।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে শেওড়াপাড়া বাজারের ৯টি মুদিদোকান ঘুরে মাত্র তিনটিতে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া গেছে। তাও ৫ লিটার সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না, মাত্র ২ লিটার সয়াবিন তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। এই বাজারের মুদি বিক্রেতা আবদুল হাকিম জানান, দোকানে এক লিটারের পাঁচটি ও পাঁচ লিটারের দুইটি সয়াবিনের বোতল আছে। যেসব ক্রেতা আগে থেকে বলে রেখেছেন, তাদের কাছেই এগুলো বিক্রি করা হবে। নতুন কাউকে দিতে পারছি না। একই অবস্থা দেখা গেছে আরও কয়েকটি বাজারেও।
এদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে মুরগির দাম কিছুটা কমেছে। অথচ রোজা উপলক্ষে মুরগির দাম বেড়েছে। এ কারণে মুরগির দাম কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছিল। বাজারে দু-তিনটি শীতকালীন সবজির সরবরাহ কমায় সেসব পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। যেমন, প্রতিটি ফুলকপি, বাঁধাকপির দাম আগের তুলনায় ৫-১০ টাকা বেড়েছে। তবে অন্যান্য সবজি আগের দামেই স্থিতিশীল রয়েছে। গতকাল প্রতি কেজি শিম মানভেদে ৩০-৬০ টাকা, টমেটো ২৫-৩০ টাকা, বেগুন ৪০-৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৪০-৬০ টাকা, শসা ৫০-৭০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৫০ টাকা, পেঁপে ৩০-৪০ টাকা, মুলা ২০-৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
রিপন মজুমদার নামে আরেক ক্রেতা বলেন, রোজার আগেই তেল-চালের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, তাতে রোজায় কী হবে বলা মুশকিল। সরকারের উচিত, এখনই ব্যবসায়ীদের লাগাম টেনে ধরা। সব ধরনের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া। না হলে রোজায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য চলা কষ্টকর হয়ে পড়বে। এই সরকারের কাছে কিন্তু আমাদের বেশি প্রত্যাশা নেই। তারা যদি শুধু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কমায় তাতেই আমরা সন্তুষ্ট।
রাজধানীর নাজিরাবাজারের চাল বিক্রেতা শরিফ আহমেদ বলেন, চালের দাম কমার বদলে উল্টো বেড়ে যাচ্ছে। মিল পর্যায়ে তদারকি না থাকাই সমস্যা হয়েছে। তদারকি না বাড়ালে সামনে চালের দাম আরও বাড়বে বলে জানান এই ব্যবসায়ী।
জানা গেছে, রাজধানীতে টিসিবির এসব ট্রাকসেল থেকে ফ্যামিলি স্মার্ট কার্ড ছাড়াও ২০০ মানুষকে পণ্য দেয়া হয়। তবে সেখানে বাস্তবতা ভিন্ন পরিলক্ষিত হচ্ছে। মানুষের উপস্থিতি এত বেশি থাকছে যে হুড়োহুড়ি, ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি ও মারামারির ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্য থেকে যারা পণ্য পান তার চোখ-মুখে একচিলতে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। কিন্তু ট্রাকের সামনে লম্বা লাইনে যে পরিমাণ মানুষ থাকে তাদের বেশিরভাগই ফেরেন খালি হাতে। বিশেষ করে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষেরা পণ্য পাওয়ার তালিকায় থাকেন না।
সরেজমিনে দেখা যায়, আসন্ন রমজান মাস ঘিরে টিসিবির পণ্যের প্রতি নিম্ন আয়ের মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ একেবারেই কম। বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির গাড়ি এসে দাঁড়ানোর আগেই প্রায় প্রতিটি ট্রাকের পেছনে ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষের লম্বা সারি হয়। জনবহুল আবাসিক এলাকায় মানুষের সংখ্যা আরও বেশি থাকে। এর মধ্যে ২০০ মানুষকে টোকেন বিতরণ করে পরে পণ্য দেয়া হয়। যদিও বিক্রি কার্যক্রম চলা ওই দু-তিন ঘণ্টায় আরও কয়েকশ’ মানুষ পণ্য নিতে এসে আশাহত হয়ে ফিরে যান। সব মিলিয়ে বরাদ্দের চেয়ে পণ্য নিতে মানুষের সংখ্যা এলাকাভেদে দ্বিগুণ থেকে চারগুণ হয়। দু’দিনে রামপুরা, মালিবাগ, মৌচাক, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণির একাধিক স্থান ও একাধিকবার বিক্রি কার্যক্রম পরিদর্শনে দেখা যায়, টিসিবির ট্রাকের পেছনে দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য পাননি কেউ কেউ। আবার অনেকে আগে এলেও ট্রাক আসার সঙ্গে সঙ্গে হুড়োহুড়ি-ঠেলাঠেলিতে টিকতে পারেন না। অনেকে লাইনে থাকলেও বিশৃঙ্খলার কারণেও টোকেন পান না। অবশেষে পণ্য না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যান অনেকে। টিসিবি থেকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল, দুই কেজি করে মসুর ডাল ও এক কেজি ছোলা, এক কেজি চিনি এবং ৫০০ গ্রাম খেজুর কিনতে পারছেন।
প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম রাখা হয় ১০০ টাকা। প্রতি কেজি চিনি ৭০ টাকা, মসুর ডাল ও ছোলা ৬০ টাকা করে কেজি এবং খেজুর ১৫৬ টাকা। যেখানে বাজারে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ২০০ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ১২৫ টাকা, মসুর ডাল ও ছোলা ১২০ টাকা এবং খেজুর ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। অর্থাৎ টিসিবির একটি প্যাকেজ পেলে সাধারণ মানুষের অর্ধেকের বেশি সাশ্রয় হয়। মূলত এই অর্থ সাশ্রয়ের জন্যই তীব্র ভিড় সত্ত্বেও মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন।
টিসিবি সূত্রে জানা গেছে, রমজানজুড়ে ঢাকা ও দেশের বিভাগীয় শহরসহ বিভিন্ন স্থানে এভাবে ট্রাকসেলে ১২ লাখ পরিবারের মধ্যে পণ্য বিক্রি করা হবে। এছাড়া টিসিবির নিয়মিত উপকারভোগী ৫৭ লাখ স্মার্ট কার্ডধারী পরিবার ভর্তুকি মূল্যে পণ্য পাবে। স্মার্ট কার্ডে পণ্য বিক্রিতে কিছুটা শৃঙ্খলা থাকলেও ট্রাকসেলে যে কেউ পণ্য নিতে পারেন বলে বিশৃঙ্খলা বেশি। টিসিবির নিবন্ধিত ডিলার বা সরবরাহকারীরা ট্রাকে প্রতিদিন ঢাকা শহরের ৫০টি স্থানে পণ্য বিক্রি করেন।
দেখা গেছে, টিসিবির এসব ট্রাকের পেছনে নারী ও পুরুষরা সাধারণত দু’টি সারিতে দাঁড়ান। যিনি আগে আসবেন তিনি লাইনের সামনে থাকবেন-নিজেদের মধ্যে এমন সমঝোতায় সবাই ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করেন আগে থেকেই। কিন্তু ট্রাক এসে দাঁড়ানোর পরে এ শৃঙ্খলা থাকে না। কারণ ট্রাকের সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে আসেন শতাধিক মানুষ। এরপর আগে ও পরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে শুরু হয় হুড়োহুড়ি-ঠেলাঠেলি। এরপর ডিলারের কর্মচারীরা উপস্থিত মানুষের মধ্যে টোকেন বিতরণ করেন। অনেক ক্রেতা আগে পণ্য নেয়ার জন্য লাইন ভেঙে সামনে চলে যান টোকেন নিতে। তাতেই শুরু হয় হট্টগোল। এসব হুড়োহুড়িতে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পড়েন বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষেরা। মৌচাকে সত্তরোর্ধ্ব সাফিয়া বেগম বলেন, আমাগো গায়ে জোর নাই। তিনদিন ধরে ঘুরছি, ধাক্কাধাক্কি করে সিরিয়াল নিতে পারিনি। ওই সময় সাফিয়া বেগমের সঙ্গে থাকা কয়েকজন জানান, অনেকের আগে এসেছিলেন সাফিয়া। সেখানে আবুল হোসেন নামের আরেকজন বয়স্ক ব্যক্তি বলেন, গাড়ি আসার আগে ২০ থেকে ২২ জনের পেছনে ছিলাম। এরপর যখন টোকেন দিলো তখন ৭৬ নম্বর সিরিয়াল পেলাম। এ কারণে বুঝতেও পারছি না যে শেষ পর্যন্ত পণ্য পাবো কি না।
এদিকে প্রতিটি স্থানেই পণ্য বিক্রি কার্যক্রমে নারীদের লাইনে চরম বিশৃঙ্খলা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা প্রকট। কারওয়ান বাজারে হাতাহাতি করা দুই নারীর মধ্যে মরিয়ম নামের একজন জানান, টোকেন নেয়ার সময় পেছন থেকে এক নারী তাকে ধাক্কা দিয়ে টোকেন নিয়ে নেন। সে কারণে মরিয়ম টোকেন পাননি। ওই নারী দল বেঁধে এসে এমন বিশৃঙ্খলা করেন। এরা একটি গ্যাং বলেও অভিযোগ করেন মরিয়ম। ওই সময় মরিয়ম ও একাধিক নারীর মধ্যে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট ঝগড়ার পর হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে কয়েকজন তাদের থামিয়ে আলাদা করেন। সেখানে ডিলারের এক প্রতিনিধি জানান, মানুষের ভিড় বেশি থাকায় বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। অনেকে তাদের কথা শোনেন না।
সুমি নামের এক নারী অভিযোগ করে বলেন, যারা টোকেন দেন তারাও স্বজনপ্রীতি করেন। তাদের অনেক পরিচিত লোক থাকে লাইনে, তাদের আগের সিরিয়াল দেন। তার অভিযোগ সকাল ৮টায় এসে তিনি লাইনে দাঁড়ান। কিন্তু গাড়ি আসার পর ধাক্কাধাক্কি করে লাইন থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে লাইনের একদম পেছনে দেয়া হয়েছে তাকে।
এদিকে ডিলার ও তাদের কর্মীদের মধ্যে যারা টোকেন বিতরণ করেন তারা ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ করেন অনেকে। বাস্তবেও তেমনটি ঘটে। পণ্য নিতে আসা ক্রেতাদের গালাগাল যেন নিয়মিত ঘটনা। আবার ক্রেতাদের মধ্যেও সজোরে ধাক্কা দেয়া, গালাগালি বলতে গেলে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এনামুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, এ পরিবেশে যারা সভ্য মানুষ তারা থাকতে পারবেন না। আর কোনো ভদ্র নারীও আসবেন না। যারা আসছেন, তারা বাধ্য হয়ে এসেছেন। এত কিছুর পরও যারা পণ্য পাচ্ছেন তাদের মুখে হাসি দেখা গেছে। পণ্য পেয়ে নাছিমা আক্তার নামের একজন বলেন, এত কষ্ট হইলেও জিনিসগুলো পাইছি। বাজারে কিনতে গেলে কত টাকা লাগতো। হয়তো কিনতে পারতাম-ই না। এখন আর রোজার বাজার নিয়ে চিন্তা থাকলো না।
টিসিবির ডিলার আদ্রিক ইন্টারন্যাশনালের পলাশ উদ্দিন বলেন, ‘বাজারে তেল পাওয়া যায় না, অন্য সব জিনিসের দামও চড়া। এখানে (টিসিবিতে) এসব পণ্য অর্ধেক দামে দেয়া হয়। সেজন্য পণ্য নিতে একরকম যুদ্ধ শুরু হয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। মারামারিও হয় অনেক এলাকায়। আসলে যত মানুষ আসেন তারচেয়ে বরাদ্দ অনেক কম।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

* টিসিবির ট্রাকসেলের লাইনে দাঁড়িয়েও কেনা যাচ্ছে না পণ্য * বাজারে নেই ভোজ্যতেল, মজুত করার অভিযোগ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস
- আপলোড সময় : ২৮-০২-২০২৫ ১১:৫৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৮-০২-২০২৫ ১১:৫৩:৫৩ পূর্বাহ্ন


কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ